196288_1

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রায় ৬০০ কোটি টাকা খরচ হয়েছে ফিলিপাইনের জুয়ার আসরে। সেখানে খরচ হওয়া এই অর্থ উদ্ধারের জন্য টানা এক মাস ধরে চেষ্টা করে যাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। চীনা হ্যাকারদের একটি গ্রুপ চলতি বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে ১০১ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ অর্থ চুরি করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কোড ব্যবহার করেই এই অর্থ চুরি করা হয়। এর মধ্যে শ্রীলঙ্কায় পাচার করা হয় ২০ মিলিয়ন ডলার। বাকি সাড়ে ৭ কোটি ডলার বা প্রায় ৬০০ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে ফিলিপাইনের কয়েকটি জুয়ার আসরে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থ খরচ করা হয়েছে ‘সোলেয়ার রিসোর্ট অ্যান্ড ক্যাসিনো’ ও ‘সিটি অব ড্রিমস অ্যান্ড মাইডাস’-এ। এরপর সেই অর্থগুলোকে জুয়ার চিপস (বাজির কয়েন) হিসেবে রূপান্তরিত করে বাজি ধরার উপযোগী করা হয়। তবে শেষপর্যন্ত সেই চিপসগুলোকে নগদ অর্থে রূপান্তরিত করে হংকংয়ের একটি অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

ফিলিপাইনের দৈনিক ইনকোয়ারারের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে চুরি করা এই অর্থগুলো প্রথমে চীনা বংশোদ্ভূত ফিলিপাইনের এক ব্যবসায়ীর নামে রাখা হয়েছিল। আর সেখান থেকেই সেগুলো ওই দুটি ক্যাসিনোতে (জুয়ার আসরে) পাঠানো হয়। জুয়ার আসরে পাঠানোর আগে ৩৭০ কোটি ফিলিপাইনি মুদ্রা সমমানের সেই অর্থ একটি ফরেন এক্সচেঞ্জ ডিলারের কাছে পাঠানো হয়েছিল। জুয়ার আসর হয়ে অর্থগুলো পরে হংকংয়ে জমা করেন চীনা বংশোদ্ভূত ওই ব্যবসায়ী।

এদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, হ্যাকড হওয়া অর্থের মধ্যে শ্রীলঙ্কায় পাচার হওয়া ২০ মিলিয়ন ডলার উদ্ধার করা গেছে। বাকি ৮১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার উদ্ধার করা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, হ্যাকড হওয়া বাকি ৮১ মিলিয়ন মার্কিন ডলারও পুরোপুরি উদ্ধার করা যাবে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান বলেন, অর্থ ফেরত আনতে বিশ্বব্যাংক স্বীকৃত পদ্ধতি অনুসারে কাজ চলছে। তিনি মনে করেন, পুরো অর্থ ফেরত আনা সম্ভব হবে। আর যেহেতু অর্থগুলো কোথায় গেছে সেটি শনাক্ত করা গেছে, এ কারণে পুরো অর্থই ফেরত আনা যাবে। সেটি হয়তো কিছুটা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার।

সোলেয়ার-রিসোর্ট-অ্যান্ড-ক্যাসিনো

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহা বলেন, ফিলিপাইনের এন্টি মানিলন্ডারিং কর্তৃপক্ষ, তাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং সেখানকার আদালত সবাই এ বিষয়ে বাংলাদেশকে সহায়তা করছে। ফিলিপাইনের এন্টি মানিলন্ডারিং কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আমাদের সমঝোতা চুক্তি আছে। আমাদের বর্তমান অবস্থাটা আরও সুদৃঢ় হয়েছে এবং আমরা অচিরেই পুরো টাকা ফেরত পাবো আশা রাখছি।

জানা গেছে, প্রথম চারটি অর্ডারের বিপরীতে ফেডারেল রিজার্ভ থেকে ফিলিপাইন ও শ্রীলঙ্কায় ১০ কোটি ডলার পরিশোধ হয়ে যায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে আরও ২০ কোটি ডলার চুরির চেষ্টা করেছিল হ্যাকাররা। বাংলাদেশ, যুক্তরাষ্ট্র ও ফিলিপাইনের ছুটির দিনকে একত্র করে এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে। গত ৫ ফেব্রুয়ারি যেদিন বাংলাদেশ ব্যাংকের সিস্টেম থেকে অর্থ স্থানান্তরের পরামর্শগুলো যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকে পাঠানো হয়, সেদিন ছিল শুক্রবার। শুক্র ও শনিবার বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোতে সাপ্তাহিক ছুটি পালিত হয়। আবার রবিবার ছুটি যুক্তরাষ্ট্রে এবং সোমবার চীনের নববর্ষ উপলক্ষে ছুটি ছিল ফিলিপাইনে। তিন দেশে ভিন্ন ভিন্ন দিনের ছুটির দিনগুলোকে সমন্বয় করেই হ্যাকাররা এ ঘটনা ঘটিয়েছে।

সোলেয়ার-রিসোর্ট-অ্যান্ড-ক্যাসিনো

জানা গেছে, এক ব্যাংক থেকে অন্য ব্যাংকে অর্থ স্থানান্তরের জন্য যে সংকেতলিপি (সুইফট কোড) রয়েছে, সেটি ব্যবহার করেই বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ চুরি করা হয়েছে। আর এ কাজটি করা হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোড ব্যবহার করে। এভাবেই অর্থ স্থানান্তরের ৩০টি পরামর্শ (অ্যাডভাইস) পাঠানো হয়েছিল ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কের কাছে। ওই ৩০ পরামর্শের মধ্যে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে ৫টি পরামর্শ কার্যকর হয়। তাতে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্ক থেকে ১০১ মিলিয়ন ডলার স্থানান্তরিত হয়ে যায় ফিলিপাইনে। ত্বরিত ব্যবস্থা নিয়ে বাকি ২৫টি পরামর্শের কার্যকারিতা থামানো হয়। ধারণা করা হচ্ছে, ওই ২৫টি পরামর্শ কার্যকর হয়ে গেলে তাতে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকে রাখা রিজার্ভের আরও বড় অংশ চুরি হয়ে যেত।

2

সূত্র জানায়, পেমেন্ট সিস্টেমে এত অল্প সময়ে বড় অংকের বেশ কয়েকটি অর্ডারের বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে ফেডারেল রিজার্ভ বাকি অর্থ পরিশোধ বন্ধ রাখে। একইসঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এ ধরনের পেমেন্ট অর্ডার দেওয়া হয়নি এমন তথ্য জানানোর পর বাকি অর্থ চুরি ঠেকানো সম্ভব হয়।

3333এদিকে, অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে অর্থ চুরির বিষয়টি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশ হওয়ার পর ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্ক দাবি করেছে, তাদের পেমেন্ট সিস্টেম হ্যাক হয়নি। মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকটির মুখপাত্র অ্যান্দ্রে প্রিস্ট বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ অ্যাকাউন্ট থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার কোনও প্রমাণ নেই। এ অর্থ লেনদেনের ক্ষেত্রে তাদের সিস্টেমে অনুপ্রবেশ বা হ্যাকের কোনও ধরনের ঘটনা ঘটেনি। এদিকে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে হ্যাকারদের চুরি করা ৮৭০ মিলিয়ন ডলার (৮৭ কোটি ডলার) মূল্যের তহবিল ফিলিপাইনের ব্যাংকিং সিস্টেমের মাধ্যমে পাচারের চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়েছে সে দেশের কর্তৃপক্ষ।

নিচের বাটনগুলোর সাহায্যে আপনার পছন্দের সামাজিক মাধ্যমগুলোতে বন্ধুদের সাথে খবরটি শেয়ার করুন

...+